জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত, জীবাশ্ম জ্বালানির নতুন প্রকল্প ও অর্থায়ন বন্ধ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত ও ন্যায়ভিত্তিক রূপান্তরের দাবিতে ঢাকায় মানববন্ধন করেছে ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-সহ ৪২টি নাগরিক ও সামাজিক সংগঠন। Global Week of Action-এর অংশ হিসেবে শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন (UNGA 81) ও COP31-এর প্রাক্কালে আয়োজিত এ কর্মসূচি থেকে জনগণের জন্য পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিনির্ভর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা বাড়িয়ে জ্বালানি ও জলবায়ু সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। জনগণের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর এবং জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পে নতুন বিনিয়োগ বন্ধের আহ্বান জানান তারা।
ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ- এর গবেষনা প্রধান, ইকবাল ফারুক স্বাগত বক্তব্যে বলেন, আর নতুন কোনো জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্প নয়, এখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানিবাস্তবায়ন করতে হবে। চলমান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ফেজ-আউটের সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের ফিজিবিলিটি স্টাডি হয়েছে; এখন আর স্টাডিতে সীমাবদ্ধ থাকা নয়, জরুরি ভিত্তিতে সেখানে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকার স্বার্থে এই রূপান্তর আর বিলম্বিত করা যাবে না।
বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন-এর সভাপতি, বদরুল আলমবলেন, জ্বালানি সংকটের বাস্তবতা দেখিয়ে দিয়েছে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশের সৌরশক্তি, বায়ুশক্তিসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য উৎস ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০,০০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়—জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এর বাস্তবায়ন এখনই প্রয়োজন।
সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন – এর সমন্বয়কারী, নিখিল চন্দ্র ভদ্র বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এখনই সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। রেল, নদীর পাড়, ওয়াপদা বাঁধ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গাগুলোতে সরকারি উদ্যোগে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি জনগণকে সম্পৃক্ত করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনেও সহায়তা দিতে হবে। আমরা শুধু আন্দোলন করতে চাই না—সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানির উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের সঙ্গে থেকে কাজ করতে চাই।
ড্রিম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন – এর সভাপতি, মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ক্ষত বহন করছে আমাদের উপকূলের মানুষ। উপকূলের প্রাণ-প্রকৃতি, আবাস ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইলিশনির্ভর লাখো মানুষের জীবন-জীবিকাও সংকটে পড়েছে। কাজের সন্ধানে উপকূলের মানুষ ঢাকার বস্তিতে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে। উপকূল রক্ষা ও মানুষের জীবন-জীবিকা বাঁচাতে হলে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রকল্প থেকে বেরিয়ে এসে এখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করতে হবে।
কোস্ট ফাউন্ডেশন-এর জলবায়ু পরিবর্তন ও সহনশীলতা বিভাগের প্রকল্প প্রধান আবুল হাসান, কোস্ট ফাউন্ডেশন বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে, কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এখনো নিশ্চিত হয়নি। তাই বছরভিত্তিক সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে এবং অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি Polluters Pay Principle অনুসরণ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর ঋণ হিসেবে নয়, গ্রান্ট হিসেবে নিশ্চিত করতে হবে। এটি বাংলাদেশের অধিকার ও জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি।
বাংলাদেশের সেন্টার ফর পার্টিসিপ্যাটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট – এর রিসার্চ অ্যান্ড ক্যাম্পেইনের সিনিয়র অফিসার, আল ইমরান বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি শুধু জলবায়ু ও পরিবেশের বিষয় নয়—এর সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা জড়িত। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের বিষয়ে আমাদের নীতি ও কমিটমেন্ট রয়েছে, কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা, প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্যোগ এখনো স্পষ্ট নয়। তাই শুধু নীতি ঘোষণা নয়, অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য ও সুনির্দিষ্ট ওয়ার্ক প্ল্যান প্রণয়ন করতে হবে।
কর্মসূচি থেকে জীবাশ্ম জ্বালানির নতুন প্রকল্প ও অর্থায়ন বন্ধ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত, ন্যায়ভিত্তিক ও জনবান্ধব রূপান্তরের মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
যৌথ আয়োজক সংগঠনসমূহ
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ (WKB), সেন্টার ফর অ্যাটমোসফেরিক পলিউশন স্টাডিজ (CAPS), ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (YASD), আপস ইয়ুথ অর্গানাইজেশন, ব্রাইটার্স, ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (YEDO), ওএবি ফাউন্ডেশন, রিভার বাংলা, বেঙ্গল পিস ফাউন্ডেশন, তরঙ্গ ফাউন্ডেশন, ক্লাইমেট ফ্রন্টিয়ার (CF), ড্রিম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (DRDF), বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন (BKF), রিভারাইন পিপল, এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভস (ERDA), সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন, সচেতন নাগরিক সমাজ সংগঠন, কোস্ট ফাউন্ডেশন, সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (CPRD), কাসমাস অর্গানাইজেশন, বারসিক (BARCIK), হাওর অঞ্চলবাসী, স্বপ্নের সিঁড়ি সমাজকল্যাণ সংস্থা, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ (MGB), ইকুইটি বিডি (EquityBD), সচেতন ফাউন্ডেশন, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (BSREA), রিভার সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট বাংলাদেশ, গ্রিনওয়ে রিনিউএবল এনার্জি ইমপ্লিমেন্টেশন অর্গানাইজেশন, ইউনিভো (UNIVO), ইউক্যান (YouCan), গ্রিনপিস ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি, ইন্ডিজেনাস পিপলস ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস (IPDS), লোকাল এনভায়রনমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল রিসার্চ সোসাইটি (LEDARS), অগ্র ফাউন্ডেশন, অর্গানাইজেশন ফর ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল কনজারভেশন (OCREC), স্কুল অব আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (SEE), তরুপল্লব, ইয়ুথনেট গ্লোবাল এবং বাংলাদেশ সাইকেল লেন ইমপ্লিমেন্টেশন কাউন্সিল।
businessbarta.com সবার জন্য businessbarta.com